সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারে সমাজ কি আরও সমাজের বিরোধী হয়ে উঠেছে?

সোশ্যাল মিডিয়া বা সমাজ মাধ্যমের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই মাইস্পেস আর অর্কুটের হাত ধরে। লিঙ্কডইনও অনেক পুরোনো সোশ্যাল মিডিয়া। মনে পড়ে ২০০৮, আমি তখন কলেজে ঢুকেছি সবে, অর্কুটে প্রোফাইল ছিল আমার। তারপর কিন্তু এদের সবাইকে একে একে পেছনে ফেলে সোশ্যাল মিডিয়ার সমার্থক হয়ে উঠল ফেসবুক। আট থেকে আশি— এই মুহূর্তে এমন একটি মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার যার ফেসবুক প্রোফাইল নেই।
প্রতিটি সোশ্যাল মিডিয়ারই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। হয়ত একশব্দে বলতে গেলে একটু অতি সাধারণীকরণ হয়ে যাবে তবু ট্যুইটার মানে সেলেব, ইউটিউব মানে ভিডিও, ইন্সটা মানে ছবি, রেডিট আর কোরা মানে লেখা।
এবং হ্যাঁ, ফেসবুক মানে সব। স অ অ ব। কিশোরীর প্রথম প্রেম ভাঙার কষ্ট, কিশোরের প্রথম অন্ত্যমিলে কবিতা লেখার উচ্ছ্বাস, যুবকের সমাজ বদলের স্বপ্ন, আধুনিক সময়কে নিয়ে প্রৌঢ়ের ক্ষোভ— সব এসে মিলে যায় ফেসবুকে। এবং ফেসবুকের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এখানে আমরা সবাই বেশ সক্রিয় থাকি, আদানপ্রদান করি এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন হোক বা বড় অর্থে বিশ্বাস— প্রায় সবকিছুই ধরা থাকে আমাদের ফেসবুক সময়রেখায়। ইউটিউবে সবাই নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক ভিডিও বানায় না, কোরায় সবাই তথ্যভিত্তিক এবং বিশ্লেষণধর্মী লেখা লেখে না, ট্যুইটার বা লিঙ্কডইন এর ব্যবহারও খুব সিলেক্টিভ। সেদিক থেকে দেখতে গেলে সমাজমাধ্যম শব্দটায় সমাজ বলতে যা বোঝায় বর্তমানে সেটা এক ও একমাত্র ফেসবুক।
আজ্ঞে হ্যাঁ, ফেসবুক এখন আমাদের কাছে পৃথিবীকে দেখার পেরিস্কোপ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা প্রত্যেকে আটকে পড়েছি অন্ধ কারাগারের পেছনে, এবং সবচেয়ে চিন্তার বিষয় আমাদের কেউ বাধ্য করেনি, এ আমাদের স্বেচ্ছা নির্বাসন। সমস্ত দরজা বন্ধ করে আমরা নিজেদের তথা পৃথিবীকে মাপছি শুধুমাত্র নিজস্ব ফেসবুক ফিড দিয়ে। এবং বলা বাহুল্য, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বর্তমান নিয়ে আমাদের বোঝাপড়া বা ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।
সেসব তো নাহয় তাও ঠিক আছে, ভাসা ভাসা ব্যাপার। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিনে ভালো থাকা? সুখের হিসেব? মনোযোগ ক্ষমতা? বন্ধুত্বের সংজ্ঞা? ভালোবাসার মানে? গভীরভাবে ভাবতে পারার ক্ষমতা? মানসিক শান্তির খোঁজ?
সোশ্যাল মিডিয়া প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ এই দু’ভাবেই এদের প্রত্যকেটিকে প্রভাবিত করছে। আমরা আর কিছুই শুধু ভালোবেসে বা খামখেয়ালে করি না। শুধু জানবো বলে বই পড়ি না, শুধু আনন্দ পাবো বলে টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখে বিভোর হই না, শুধু গভীরভাবে দুটো কথা বলব আর মুহূর্তে বাঁচব বলে কলেজ বন্ধুর সাথে রাত তিনটেয় ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে বেরোই না। আমরা সবটাই করি, কিন্তু করি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে লাইক আর ছবি তুলে ফিল্টার লাগিয়ে ইন্সটাগ্রামে দিয়ে ‘ভালোবাসা’ পাবো বলে। তাই ফেসবুকেই আমাদের পাঁচহাজার বন্ধু, কিন্তু রাত দুটোয় প্রচন্ড অস্তিত্বসংকটে ভুগে যখন আমাদের ঘুম আসেনা তখন কিন্তু ‘জেগে আছিস রে? কথা বলবি একটু?’ বলার জন্য কেউ পড়ে থাকে না আমাদের। তাই ইন্সটাগ্রামেই আমাদের চকচকে লাদাখযাপন আর তাকে ঘিরে বাহবা, অথচ জীবনের রঙ অসহায় ধূসর।
শুধু তাই নয়, আমাদের সম্মিলিত হতাশাযাপন এবং হিংস্রতা বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এমনিতে মানব বিবর্তন এবং মানব ইতিহাসের দিকে তাকালে মানুষকে খুব শান্তিপ্রিয় প্রাণী বলে মনে করার কারণ নেই। আমরা হলাম এ পৃথিবীর একমাত্র জীব যার একটিই গণ একটিই প্রজাতি। কোনও সহোদর নেই আমাদের। কেন জানেন? কারণ আমরা তাদের খুন করেছি এককালে শুধুমাত্র নিজেরাই বেঁচে থাকব বলে। আর বিগত দশ হাজার বছরে বিশেষত বিগত দুশো বছরে সভ্য হতে গিয়ে, শ্রেষ্ঠ হতে গিয়ে, নিজেদের ইন্দ্রিয়সুখের উৎসব ঘটাতে গিয়ে আমরা ধ্বংস করেছি এই নীলগ্রহের জল জঙ্গল মাটি। ধ্বংস করেছি একের পর এক প্রজাতিকে।
এর সাথে হঠাৎ সোশ্যাল মিডিয়ার সম্পর্ক কী? অন্য কিছু না, আমাদের এই লোভ আর হিংস্রতা আর ক্ষমতা পিপাসার মতো যে অন্ধকার দিকগুলো এককালে আমি এবং আমার চারপাশে হয়ত আর গুটিকতক মানুষ জানত এখন মুহূর্তে সেসব ইথার বেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে হাজার হাজার মানুষের কাছে। আমরা যত বেশি যুক্ত হচ্ছি নিজেদের মধ্যে, পরস্পরের মাধ্যমে ততই বেশি প্রভাবিত হচ্ছি। এবং একটা শৃঙ্খলায়িত বিক্রিয়া যেভাবে ঘটে, সেভাবেই এই প্রভাবটা গুণোত্তর প্রগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক কাঠামোয়। এবার প্রভাবটা ভালো বা খারাপ দুইই হতে পারে। মুশকিলটা হল আমরা নামেই সভ্য, ওপরেই দায়িত্ববান শান্তিপ্রিয় নাগরিক কিন্তু আমাদের গভীরে লুকিয়ে আছে যৌনাকাঙ্খী, ক্ষমতালোভী এবং হিংসাপ্রিয় এক জীব। সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে আমরা যতই পরস্পরের সাথে যুক্ত হচ্ছি ততই এই অন্ধকারগুলো সমাজের উঠোনেই ছড়িয়ে পড়ছে লাগামহীন।
সবটাই কি এতটাই খারাপ? ভালো কিছুও কি হচ্ছে না সোশ্যাল মিডিয়ায়? আমরা আরও দ্রুত নিজেদের বক্তব্য, তথ্য, দৃষ্টিভঙ্গি আদান প্রদান করতে পারছি না পরস্পরের সাথে? কোরা না থাকলে আজ এই লেখা আমি না তো লিখতে পারতাম আধঘন্টায় আর না তো আপনি তা এক লহমায় পড়তে পারতেন হাজার কিলোমিটার দূরে বসে। ইউটিউব না থাকলে মফস্বলের যে ছেলেটার মাস গেলে পাঁচশো টাকা দিয়ে ফিজিক্স পড়ার ক্ষমতা নেই সে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর বিনামূল্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভিডিয়ো গুলো দেখতে পেত না। ফেসবুক না থাকলে হয়ত দু’দশক পুরোনো স্কুলের বন্ধুদের জুটিয়ে হয়েই উঠত না রিইউনিয়নটা।
তবুও বলব ছোট বা বড়ো, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ খারাপ গুলো বলে বলে দশ গোল দিয়েছে ভালো গুলোকে। মনোযোগক্ষমতা কমে গেছে হু হু। বন্ধুর চারচাকা দেখে ঈর্ষায় ঘুম আসছে না রাতে। নিজেকে নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকা ভুলে গিয়েছি। সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে গেছে লাইক আর আপভোট আর শেয়ার। বাড়ছে মানসিক অস্থিরতা, অবসাদ।
ব্যক্তিজীবনে যদি এ জিনিস হয় তাহলে এগুলোকে যোগ করলে যা পাওয়া যাবে সমাজজীবনেও ঘটছে সেসবই। আমরা কেউই আর থামতে পারছি না। সামান্য বিরুদ্ধ মতের অন্য মানুষটির কথা শুনতে পারছি না। জাতি- ধর্ম- ভাষা- বর্ণ- দেশ যে কোনও ছুতোয় নিজেদের মতোই মনে হয় এরকম জনা কয়েককে দ্রুত জুটিয়ে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছি অন্য গোষ্ঠির ওপরে। ভুয়ো খবরের সংখ্যা শুধু হু হু বাড়ছে তাই নয়, তার জন্য দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, চাপা অবিশ্বাসে ভরে থাকছে বাতাস, গণপিটুনিতে মারা যাচ্ছে মানুষ। ব্যক্তি হোক বা সমষ্টি, আমাদের বড় করে ভাবার, তলিয়ে ভাবার, দায়িত্ব নিয়ে একটা কথা বলা এবং কাজ করার প্রবণতা হু হু কমে গিয়েছে। এবং আমার মতে এর প্রত্যেকটিতেই সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব অনস্বীকার্য।
সমষ্টিগতভাবে এই মুহূর্তে এ থেকে বেরিয়ে আসার খুব সদর্থক উপায় দেখছি না আমি। তবে ব্যক্তিগতভাবে সম্ভব অবশ্যই। আমি নিজেই দৈনন্দিনে অভ্যাস করি তা। আজ প্রায় তিনবছর হয়ে গেল আমি ফেসবুক থেকে মোটামুটি বিদায় নিয়েছি। মোটামুটি কারণ সম্পূর্ণ না; গড়ে তিন মাস অন্তর আমি ফেসবুকে ঢুকি, খুব বেশি হলে এক সপ্তাহের জন্য। এবং সেটাও ঢুকি এমনিই মজা নেওয়ার জন্য। দেখি লোকজন কী করছে, বলছে ইত্যাদি। আমার ক্ষেত্রে এটা সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ তার কারণ তিনবছর আগে এই আমারই জীবন মানে ছিল ফেসবুক। অক্সিজেন, ডালভাত, থামস আপ সব। প্রতিটি দিন প্রতিটি ইস্যু নিয়ে মতামত ব্যক্ত করা, অন্যের মত পড়া, তাদের সাথে উপযুক্ত পরিমাণে ঝগড়া করা, তাদের কাছ থেকে উপযুক্তেরও বেশি পরিমাণে ফিডব্যাক নেওয়া আমার দৈনন্দিন রুটিন ছিল। নিজের চেনা বৃত্তে তো বটেই, আধচেনা বা অচেনা অনেকের কাছেও পরিচিতি পাই এই ফেসবুকে লেখালিখির সুবাদেই। সেই আমার পক্ষে হঠাৎ করে এ হেন সন্ন্যাস নেওয়াটা নিজের কাছেই একটু আশ্চর্যের ছিল। যখন সিদ্ধান্ত নেই তখন নিজেই জানতাম না এই পথটায় চলতে পারব কি না। ঠিক কেন, কোন ব্যক্তিগত উপলব্ধি এবং কোন বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা আজ থাক বরং, অন্যদিন বলব। শুধু এটুকু বলি, তিন বছরের মাথায় এসে সোশ্যাল মিডিয়া, মূলত ফেসবুক এবং পরবর্তীকালে ইন্সটাগ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্তকে সাম্প্রতিককালে আমার নিজের জন্য নেওয়া সঠিকতম সিদ্ধান্ত মনে হয়। দৈনন্দিনে নিজেকে নিয়ে, অন্যকে নিয়ে অনেক ভালো থাকতে পারি, অনেক ভালো বাঁচতে পারি, চিৎকার আর কুয়াশা সরিয়ে অনেক পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই নিজেকে এবং সাম্প্রতিককে।
দি আমাকে এই মুহূর্তে একটিমাত্র উপদেশ দিতে বলেন, সে আপনার বয়স- পেশা- আর্থসামাজিক অবস্থান যাই হয়ে থাকুক, আমি বলব সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়ুন। অন্ততপক্ষে ফেসবুক এবং ইন্সটাগ্রাম। অথবা একেবারে ন্যূনতম করুন তার ব্যবহার। আপনার জীবনকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সে ন্যূনতম প্রভাবিত করছে এটুকু যদি মনে হয় তাহলেই ছাড়ুন। কারণ মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় সে প্রভাব নেগেটিভই।
কোরা? নাহ, আপাতত আছি এখানে। এই তিনবছরে ফেসবুকের সাথে ব্রেক আপ আমাক যে শূন্যতায় রাখার কথা ছিল তাকে পূরণ করেছে মূলত কোরা এবং ইউটিউব। এবং আমার জীবনে এদের প্রভাব এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট পজিটিভ। যেদিন নেগেটিভ হতে শুরু করবে একটুও না ভেবে সমস্ত সুতো ছিঁড়ে ফেলব এদের সাথেও।
নিজের অস্তিত্ব নিয়ে রোজ নিজেকে এমনিতেই প্রশ্নোত্তরের মুখে দাঁড়াতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে, বিব্রত হয়েই থাকি তা নিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়া তো অবশ্যই, অন্য যে কোনও মাধ্যমও যদি সেই বিব্রতবোধকে নেতির অক্ষে ত্বরান্বিত করে তাহলে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাই ভালো।
আপনার অনুভব কি অন্যরকম? কমেন্টে জানান না। সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্যে এই প্ল্যাটফর্মটিকে যেন চিরদিন তার অনন্যতায় দেখতে পারি তার জন্য আমার সাথেই হয়ত একই সক্রিয়তায় বাঁচা দরকার আপনারও।

About the Author: রতন কুমার রায়

আমি ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে একজন পেশাদার ব্লগার । আমার জ্ঞান অনুযায়ী, আমি অন্যদের ফ্রিল্যান্সার সাহায্য করার চেষ্টা করি । আমি ২017 সাল থেকে ব্লগিং শুরু করেছি । আমি অ্যাফিলিয়েট বিপণন, সিপিএ বিপণন, এসইও, ওয়ার্ডপ্রেস ডেভেলপমেন্ট এবং ওয়েব ডিজাইনও করি। আমি বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং বাজারে কাজ করি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *